আজ মহান শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস

99
0

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আমাদের চরম মূল্য দিতে হয়েছে। প্রায় নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধে প্রাণদান করেছেন এ দেশের অজস্র মানুষ। তাদের মধ্যে যেসব খ্যাতনামা বরেণ্য ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন তারাই হলেন শহীদ বুদ্ধিজীবী। এসব শহীদ বুদ্ধিজীবীর মধ্যে রয়েছেন শিক্ষক, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, সঙ্গীতজ্ঞ ও সমাজসেবক।

পাকিস্তানি সৈন্যরা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে বাংলাদেশের নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওরা আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে একে একে হত্যা করে এ দেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের। ঢাকা ও ঢাকার বাইরে পুরো দেশের নানা পেশার মেধাবী মানুষকে হত্যার জন্য তারা তালিকা তৈরি করে। এ দেশের স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর মাধ্যমে তারা হত্যার এ নীলনকশা বাস্তবায়ন করে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনারা বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রথম ধাপে আক্রমণ চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন এম মুনিরুজ্জামান। প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শুনে তিনি পবিত্র কুরআন শরিফ পড়তে বসেছিলেন। ওই অবস্থা থেকেই তাকে ধরে, টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনারা। ওই বাড়িতেই নিচতলায় থাকতেন ইংরেজির খ্যাতিমান অধ্যাপক জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা। হানাদার বাহিনী ঘর থেকে তাকেও ধরে নিয়ে যায়। তারপর দু’জনকেই নিচের সিঁড়িতে নিয়ে গুলি করে। এ বাড়ির খুব কাছেই থাকতেন দর্শনের যশস্বী অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব। নিরহংকার, সহজ-সরল এই জ্ঞানী মানুষটির মুখে হাসি লেগেই থাকত সব সময়। একই রাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন ডক্টর গোবিন্দ দেবসহ আরো কয়েকজন শিক্ষক।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর তাদের দোসররা জানত, সাংবাদিকরাও তাদের জন্য বিপজ্জনক। তাই তারা কয়েকটি সংবাদপত্র অফিসেও ওই রাতে আগুন লাগিয়ে দেয়। প্রতিভাবান সাহিত্যিক এবং সাংবাদিক শহীদ সাবের সে রাতে ঘুমিয়েছিলেন দৈনিক ‘সংবাদ’ কার্যালয়ে। আগুনের লেলিহান শিখায় সে রাতে দগ্ধ হয়ে মারা যান তিনি। শহীদ হন সম্পাদিকা সেলিনা পারভীন। প্রতিভাময়ী কবি ছিলেন মেহেরুন্নেসা। মাত্র পঁচিশ বছর বয়সেই তিনি শহীদ হন।

মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টাই চলে এমন অনেক নির্মম হত্যার ঘটনা। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তান গণপরিষদে তিনিই প্রথম বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি করেছিলেন। ৮৫ বছরের বৃদ্ধ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে তার কুমিল্লার বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করে পাকিস্তানিরা।

চুরাশি বছর বয়সের যোগেশ চন্দ্র ঘোষ জীবনের বেশির ভাগ সময় রসায়নের অধ্যাপনা করেছেন। একসময় তিনি ছিলেন ঢাকা জগন্নাথ কলেজের অধ্যক্ষ। তার প্রতিষ্ঠিত আয়ুর্বেদীয় প্রতিষ্ঠান ছিল খুব বিখ্যাত। ৭৮ বছর বয়সী রণদা প্রসাদ সাহা জন্মেছিলেন গরিবের ঘরে। নিজের চেষ্টায় অনেক বড় হয়েছিলেন। জনহিতকর অনেক কাজ করেছিলেন বলে তাকে বলাহত দানবীর। চট্টগ্রামের কুণ্ডেশ্বরীর প্রতিষ্ঠাতা বিখ্যাত সমাজসেবক নতুন চন্দ্র সিংহ। তারা সবাই নির্মম হত্যার শিকার হন।

‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটির সুরকার আলতাফ মাহমুদ। প্রখ্যাত এই সুরসাধক ও সঙ্গীতজ্ঞও পাকিস্তানিদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন।

মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে পরাজয় নিশ্চিত বুঝতে পেরে পাকিস্তানি শাসকচক্র বাংলাদেশকে চিরতরে মেধাশূন্য করার এক ঘৃণ্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অগ্রসর হয়। তারা এ দেশের স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সহায়তায় এ দেশের চিন্তাবিদ, শিক্ষাবিদ ও সৃজনশীল ব্যক্তিদের হত্যা করার জন্য নতুনভাবে পরিকল্পনা করে। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে তারা ঢাকার বাড়ি বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় দেশের বিশিষ্ট ও প্রতিভাবান মানুষকে। এদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী ও আনোয়ার পাশা, ইতিহাসের অধ্যাপক সন্তোষ চন্দ্র ভট্টাচার্য ও গিয়াসউদ্দিন আহমদ; ইংরেজির অধ্যাপক রাশীদুল হাসান। আরো ছিলেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক সাংবাদিক শহীদুল্লা কায়সার, সাংবাদিক সিরাজউদ্দীন হোসেন, নিজামউদ্দীন আহমদ ও আ ন ম গোলাম মোস্তফা, খ্যাতনামা চিকিৎসক ফজলে রাব্বী, আবদুল আলীম চৌধুরী ও মোহাম্মদ মোর্তজা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদের ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া গিয়েছিল মিরপুর ও রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে। কারো কারো লাশও পাওয়া যায়নি। তাদের স্মরণে আমরা প্রতি বছর ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করি।

শহীদদের রক্তে ভিজে আছে বাংলাদেশের মাটি। যেমন তাদের জন্য ভিজে আছে স্বজনদের চোখ। দেশের জন্য যারা প্রাণ দিলেন, তারা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান। তারা আমাদের অতি আপনজন। যাদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা পেয়েছি, আমরা তাদের ভুলব না।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here